পাহাড় পুর | Pahar Pur Bangla Golpo

পাহাড় পুর

শীত যাই যাই করছে। ক'দিন পরই গরম পড়বে। কিন্তু আমাদের স্কুলে বনভোজনের কোনো আয়োজন নেই। আমরা প্রতিদিন টিফিনের সময় আমতলায় বসে এ আলোচনাই করি। 
আসিফ বলল, 'শুধু নিজেরা আলোচনা করলেই হবে? তোমরা তো বড় আপার কাছে যেতে চাও না।
 বড় আপাকে না বললে কিছু হবে?' শেষে ঠিক হল আমি, মনিরা, ঝুমুর, রফিক ও মৌ বড় আপার কাছে কথাটা বলতে যাব। বড় আপা খুব সহজেই রাজি হলেন। তারিখ ঠিক হল ফাল্গুনের মাঝামাঝি। যাব নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর। আমরা খুশি মনে বড় আপার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। 
মনিরা আর ঝুমুর বলল, 'আমরা সালাদ কাটব। আসিফ চুলার কাঠ কাটবে।' আমি বললাম, 'আমি শুধু বসে থাকব। মনিরা বলল, 'তুমি কবে কাজ করো শুনি?' আমি বললাম, 'আমি তো তোমাদের মতো কাজের মেয়ে না।' এ কথায় মনিরা খুব খেপে গেল। ঝুমুর বলল, 'থাক, ঝগড়ার দরকার নেই। 
চল সবাই পিকনিকের আয়োজন করি। যাবার আগের দিন বড় আপা স্যারদের ডেকে আমাদের নিয়ে বসলেন। স্যারকে বড় আপা দায়িত্ব ভাগ করে দিলেন। 
আমরা যে যার মতো পোশাক পরতে পারব শুনে সবাই খুব খুশি। ঠিক হল সকাল সাতটায় স্কুল গেট থেকে বাস ছাড়বে।
সকাল দশটার দিকে আমরা পাহাড়পুরে পৌঁছলাম। বেশ খানিকটা দূর থেকেই অবশ্য উঁচু পাহাড়ের মতো জায়গাটা দেখা যাচ্ছিল। 
সবাই আনন্দে বলে উঠল, 'ঐ যে!' আমরা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। জহির স্যার রান্নার দায়িত্বে। তিনি বাবুর্চি নিয়ে এক পাশে চলে গেলেন। সবাই খুব খুশি। 
কিন্তু বড় আপা যখন বললেন 'আমি তোমাদের একটা ক্লাস নেব', তখন যেন সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল।
মনিরা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, 'আপা এখানেও ক্লাস?' ঝুমুর কানে কানে বলল, 'যদি পড়া ধরে?'
আমাদেরকে বড় আপা একটা গাছের ছায়ায় নিয়ে গেলেন। আমরা সেখানে বসলাম। বড় আপা বললেন, 'আমি ক্লাস নেব না। গল্প শোনাব। শুনবে তো?' সবাই বললাম, 'আপা, হ্যাঁ।
এখানে শুধু যে আমরাই এসেছি তা নয়। দেখলাম গোটা এলাকাতেই অনেক মানুষ। ওরাও পাহাড়পুর দেখতে এসেছে। আমাদের সামনে বড় আপা দাঁড়ালেন। বললেন, 'আমার কথা শেষ হলে তোমরা বেড়াবে। খুঁটে খুঁটে সব দেখবে, তখন ভালো লাগবে।
' বড় আপা আরো বললেন, 'পাহাড়পুর নাম হলেও এখানে কোনো পাহাড় নেই। এ এলাকা সমতল। যাঁরা এটি তৈরি করেছেন তাঁদের আমলে এ জায়গাটির নাম ছিল সোমপুর।
' আসিফ বলল, 'আপা, কারা এটি তৈরি করেছে?' 'পাল রাজারা', বললেন আপা, 'আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে এটি তৈরি করেন পাল রাজা ধর্মপাল। 
এ বিহারের চারদিকে ১৮ ফুট পুরু দেয়াল ছিল। দরজা ছিল একটি।' ঝুমুর বলল, 'আপা, বিহার কী?' আমার মনে হল ঝুমুরের বোধ হয় এতক্ষণে বিশ্বাস হয়েছে বড় আপা পড়া ধরবেন না। আপা বললেন, 'বিহার হল বৌদ্ধদের মঠ বা মন্দির। 
আগের আমলে বিহার বলতে কেবল বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় বোঝাতো।' মৌ বলল, 'ওরে বাবা, এটা তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। বড় আপা দূরে দেখিয়ে বললেন, 'দেখ, ঐ যে মাঝখানে প্রায় ৭০-৮০ ফুট উঁচু, যাকে তোমরা পাহাড় বলছ। ওটা ছিল মন্দির।  আর মন্দিরকে ঘিরে ঘর ছিল ১৭৭টি। ঘরগুলো বেশ বড় ছিল।
এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বাস করতেন। লেখাপড়ার জন্য এটা ছিল আদর্শ স্থান। তাদের জন্য গোসলখানা, খাবারঘর, রান্নাঘর সবই ছিল। চল সবাই এখন ঘুরে দেখি।'
সবাই চুন-সুড়কি দেওয়া পথে হাঁটতে লাগলাম। মূল মন্দিরের চারদিকে ঘুরলাম। দেখলাম দেয়ালে বসানো পোড়ামাটির নানা মূর্তি। আমরা দল বেঁধে হাঁটছিলাম। ঘরগুলো দেবে গেছে মাটির নিচে। কিন্তু মনে হচ্ছে জায়গাটা কত পরিচিত। বড় আপার গল্প না শুনলে শুধু হেঁটেই যেতাম, কিছুই বুঝতাম না।
এক জায়গায় দেয়ালের ওপর বসলাম। ভাবছি, আজকের এই পাড়া- গাঁ কয়েক শত বছর আগে কত বড় শিক্ষাকেন্দ্র ছিল।  কত ছাত্র আসতো নানা দেশ থেকে। যেখানে বসে আছি হয়তো কোনো ছাত্র দিনরাত খেটে তাঁর পড়া তৈরি করতেন এখানে।  মনিরা বলল, 'এই চল সবাই, জহির স্যার ডাকছেন, বোধ হয় রান্না হয়ে গেছে।' সবাই খেতে বসলাম। বড় আপাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এগুলো এরকম হল কীভাবে?' আপা বললেন, 'এক সময় কিছু বিদেশি রাজা আর এদেশের রাজাদের বারবার আক্রমণে এর খুব ক্ষতি হয়। পরবর্তী সময়ের রাজারা আর সাহায্য সহযোগিতা করলেন না। ভিক্ষুরাও চলে গেল অন্য জায়গায়। 
এভাবেই নষ্ট হতে থাকল এত বড় শিক্ষাকেন্দ্র। এখন অবশ্য এটা সরকারিভাবে রক্ষা করা হচ্ছে। 
না হলে এক সময় হারিয়ে যাবে আমাদের অনেককাল আগের এই সম্পদ।' পেট পুরে খেলাম। 
বাসে বাড়ি ফিরছি আর ভাবছি, আরো অনেকবার এখানে আসব। আরো জানব।

দৈত্য প্রজাপতির গল্প | The Story Of monster butterfly 2024

 


দৈত্য প্রজাপতি

ফেন্টু মামা আর আমি। যাচ্ছিলাম সিলেট। বেড়াতে। সিলেট জেলায় ঢুকতেই রাত্রি হল। অন্ধকার রাত। দুপাশে ছোটবড় পাহাড়। আবছা দেখা যাচ্ছে।তার মধ্য দিয়ে রেলগাড়ি ছুটে চলেছে। এমন সময় রেলগাড়িটা হঠাৎ থেমে গেল। বেশ কিছু সময় পেরিয়ে গেল, গাড়ি আর চলে না।
সবারই এক কথা, চলছে না কেন? ফেন্টু মামা বললেন, 'এর আগে তিনবার থেমেছে। কিন্তু এবারের মতো এত দেরি তো করেনি।' জানালা দিয়ে সবাই সামনে দেখার চেষ্টা করছে। কিছুই বোঝা গেল না। ফেন্টু মামা আমাকে বললেন, 'একটু দেখে আসি ব্যাপারটা কি।' বলামাত্রই বগির মাঝের রাস্তা দিয়ে মামা এগোতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পরে তিনি ফিরলেন। ইঞ্জিন ঘরের লোকজনের সাথে মামার কথা হয়েছে। একটা বিরাট দৈত্য নাকি বারবার রেলগাড়ি থামাতে বলছে। এতক্ষণ চালক ভয়ে ভয়েই রেলগাড়ি চালিয়েছে। বিপদ থাকায় এর আগে তিনবারই থামাতে হয়েছে। কিন্তু এবার মহাবিপদ। 

রেল লাইনের দুপাশে দৈত্যের দু'পা, আর দু'হাত ওপরের দিকে। হাত নাড়ানো দেখলে মনে হয়, পাহাড় ভেঙে ফেলবে।আশ্চর্যের বিষয়, রেলগাড়ি চললে দু'হাত নেড়ে থামতে বলে, আবার থামলে চুপচাপ। ফেন্টুমামা এসে যখন বলছিলেন, তখন বগির সবাই ভয়ে একেবারে জড়োসড়ো। আমি কিন্তু একটুও ভয় পাইনি। বরং দৈত্যটাকে নিজের চোখে দেখতে ইচ্ছে করছিল।

মামার কানে ফিস্ফিস্ করে বললাম, 'মামা, তুমি নিজে দেখেছ?' মামা বললেন, 'নারে, বাপু, না।' মামাকে বললাম, 'চল না মামা, দৈত্যটা দেখে আসি।' আমার কথায় ফেন্টু মামা ভয়ে ভয়ে রাজি হলেন। আমাদের সাথে ওই বগির কয়েকজন যাত্রীও গেলেন। এক বগি থেকে আর এক বগি, এমনি করে একেবারে সামনের বগিতে গিয়ে সবাই থামলাম। রেলগাড়ি থেকে নামব, এমন সময় মামা হাত ধরে টেনে বললেন, 'সত্যিই দেখবি? না গেলে হয় না।' আমি বললাম, 'চলো তো, মামা।' মামা আবারও বললেন, 'বন্দুকটন্দুক কিছুই নেই।' আমি বললাম, 'বুদ্ধি তো আছে।' সবাই নামলেন। রেলগাড়ির সামনে যেতেই ফেন্টমামা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা দৈত্যটাকে দেখে দিলেন এক ছুট।

মামা ও অন্য যাত্রীদের পড়িমড়ি দৌড় দেখে রেলগাড়ির একজন চালক এগিয়ে এলেন। আমাকে দেখে বললেন, 'কোথায় যাচ্ছ, খোকা?' বললাম, 'দৈত্য দেখতে।' তার নিষেধ শোনার আগেই আমি একেবারে গাড়ির সামনে চলে গেছি। গিয়ে দেখি রেলগাড়ির হেডলাইটে একটি প্রজাপতি বসে আছে।

প্রজাপতির ছায়াটাই দেখতে বিশাল দৈত্য মনে হচ্ছে। আমি এগিয়ে গিয়ে সেটি উড়িয়ে দিলাম। প্রজাপতি উড়ে যেতেই দৈত্যটি মিলিয়ে গেল। সবাই খুব খুশি। পারলে আমায় মাথায় নিয়ে নাচে। জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা খোকা, তুমি বুঝলে কী করে?' বললাম, 'এতো খুব সহজ ব্যাপার। হেডলাইটের ওপরে কিছু পড়লে তার ছায়া দূরে গিয়ে বড় দেখায়। একথা তো আমরা বিজ্ঞান বই পড়েই জেনেছি।' যাত্রীরা যার যার সিটে গিয়ে বসলেন। সবাই চিন্তামুক্ত। রেলগাড়ি আবার চলতে শুরু করল। 


পাথরের সাজা বাংলা গল্প | Patharer Shaja Bangla Story 2024

 

পাথরের সাজা বাংলা গল্প

পাথরের সাজা

অনেক দিন আগের কথা। এক গ্রামে বিজু নামে এক বালক বাস- করত। তার খুব শখ শহর দেখতে যাবে। ইচ্ছে হলেই তো আর হয় না। সে সময় একালের মত রেলগাড়ি, ইস্টিমার, উড়োজাহাজ, মোটরগাড়ি কিছুই ছিল না। সে তার মা-বাবার কাছে শহর দেখার জন্য প্রতিদিন আবদার জানায়। অবশেষে অনেক চিন্তাভাবনার পর তাঁরা রাজি হলেন। বাবা তার হাতে ছোট্ট একটা থলে দিলেন।

রেখো। শহরে চলাফেরা, থাকা খাওয়ার জন্য টাকাপয়সার খুব দরকার। " মা পথে ঘাটে খাওয়াদাওয়ার জন্য পুঁটলি বেঁধে খাবারদাবার দিয়ে বললেন, 'পথে খিদে লাগলে এগুলো খেয়ো। 'পরদিন খুব সকালে বিজু মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শহরের পথে রওনা দিল। বিজুদের গ্রাম থেকে শহর অনেক দূরের পথ। চলতে চলতে সকাল, দুপুর, বিকেল গড়িয়ে ঠিক সন্ধ্যেবেলায় বিজু শহরের ধারে পৌঁছে গেল। অবাক হয়ে সে দেখে আলোয় ঝলমল করছে সারা শহর। মনে মনে খুব খুশি। এত দিনের শহর দেখার স্বপ্ন তার পূরণ হতে চলেছে। শহর তো তার অপরিচিত। কাউকে চেনে না। শহরের কোথায় কী আছে তাও তার অজানা।

ভাবল, বরং এই সন্ধ্যায় অপরিচিত শহরে না ঢুকে এক গাছতলায়। কোনমতে রাতটা কাটিয়ে দেয়াই ভালো। মায়ের দেয়া খাবার খেয়ে গাছতলায় ঘুমানোর ব্যবস্থাও করে নিল। বাবার দেয়া টাকার থলেটা নিয়েই এখন যত বিপদ। বিদেশ-বিভুঁয়ে টাকা না হলে তো চলে না। যেখানে শোবার ব্যবস্থা হয়েছে তার ঠিক পাশেই বেশ বড়সড় একটা পাথরের খন্ড। বালকটি পাথরের নিচে টাকার থলেটা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

আলোয় চারিদিক ভরে গেছে। পাখির কিচিরমিচির শব্দ। হাতমুখ ধুয়ে মায়ের দেয়া বাকি খাবারটুকু খেয়ে শহরে ঢোকার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিল। যাবার সময় পাথরের নিচে থেকে টাকাগুলো নিতে গিয়ে দেখে থলে নেই। পাথরের আশেপাশে নিচে কোথাও খুঁজে টাকার থলেটা পাওয়া গেল না।

করবে? অসহায় বালক কোনো পথ না পেয়ে কাঁদতে লাগল। শহরের ধারের ওই দিক দিয়ে অনেক লোকের যাতায়াত। পথ দিয়ে যারাই যায় বিজুর কান্না দেখে দাঁড়ায়। কেউ সান্ত্বনা দেয়, কেউ বা টাকার থলেটা খোঁজাখুঁজি করে। পথিকদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।

চুরি হয়ে যাওয়া টাকাটা কোথাও পাওয়া গেল না।

ঠিক ওই সময় শহরের বিচারক তাঁর পাইকপেয়াদা নিয়ে ওই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। অনেক মানুষের ভিড় আর কান্নারত বালককে দেখে তিনিও থামলেন। বালক ও উপস্থিত সকলের কাছ থেকে বিষয়টি জানলেন। বিচারক তাঁর পাইক-পেয়াদাদের হুকুম দিয়ে বললেন, 'এই চোর পাথরটাকে তুলে নিয়ে আমার আদালতের কাঠগড়ায় হাজির কর।' এ কথা বলে তিনি হনহন করে আদালতের দিকে পা বাড়ালেন।

তার আবার বিচার? এমন আজব বিচারের কথা কি কেউ কোনোদিন শুনেছে? সকলের মধ্যেই অসম্ভব কৌতূহল। এমন আজব বিচার দেখতেই হবে। একে একে সকলেই আদালতে গিয়ে উপস্থিত হল। বিশাল আদালত ঘর। ঘরে ঠাঁই নেই। কৌতূহলী শহরবাসীর ভিড়। বিচারক তাঁর আসনে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। কাঠগড়ার পাটাতনের ওপর পাথরটা। বিচার শুরু হল।  কারো মুখে কোনো কথা নেই। আদালতঘর নীরব।

সামি পাথর হাজির!" বিচারক টেবিলে তিনবার হাতুড়ি পিটিয়ে বললেন, "অর্ডার, অর্ডার, অর্ডার। আসামি পাথর, নিরপরাধ বালকের টাকাপয়সা চুরি করেছে।  সরেজমিনে দেখে মনে হয় পাথরই এ অর্থ চুরি করেছে। তাবে পাথর নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করার সুযোগ পাবে।  এ সম্পর্কে তার কথা আদালত ধৈর্য সহকারে শুনে ন্যায্য বিচার করবে।'বিচারকের কথা শুনে আদালতে উপস্থিত সকলের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল। বিচারক তার হাতুড়ি তিনবার পিটিয়ে আবার বললেন, "অর্ডার, অর্ডার, অর্ডার। সবাই চুপ করুন।  এটি আদালত। বিচারের সময় হাসি-তামাশা করা অপরাধ। এ অপরাধের জন্য আদালত ইচ্ছে করলে শাস্তিদান করতে পারে। সকলেই চুপ করে গেল। বিচারক পাথরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার নাম এবং বাবার নাম কী? বয়স কত?"

*তুমি কি বালকের টাকাটা চুরি করেছো??  পাথর চুপ।

*টাকাগুলো কোথায় রেখেছো?” পাথরের কাছ থেকে কোন জবাব মেলে না। বিচারক পাথরের কোনো উত্তর না পেয়ে পাথরকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণা করলেন, *পাথরটি বালকের টাকা চুরি করার জন্য অপরাধী। তাকে ত্রিশ ঘা বেত মেরে হত্যা করা হোক!"রায় শুনে উপস্থিত সকলে হাসি চাপতে চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুতেই চেপে রাখতে পারে না। আদালত কক্ষের মধ্যে খুক খুক, হি হি, হাঃ হাঃ শব্দ গম গম করতে থাকে। এবার বিচারক জোরে জোরে হাতুড়ি পিটিয়ে সবাইকে চুপ করে থাকতে আদেশ দিলেন। “রায়ের আর একটা অংশ আছে, বলে তিনি ঘোষণা দিলেন "আদালতের বিচার কাজে বাধা দেওয়া এবং আদালতকে সঠিক সম্মান না জানানোর জন্য সবাইকে পাঁচ টাকা করে জরিমানা করা হল।'

ঘোষণা শুনে উপস্থিত সকলেই হতবাক। কিন্তু, আদালতের রায় তো হেরফের হবার নয়। সবাই মানতে বাধ্য। একে একে সকলেই গুনে গুনে পেয়াদার হাতে জরিমানার টাকা দিয়ে তবে রেহাই পেল। বিচারক বিজুকে ডেকে বললেন, “খোকা, এই টাকাগুলো তুমি রাখ। তোমার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করার জন্য শহরের পক্ষ থেকে তোমাকে এই অর্থ দেওয়া হল। আশা করি এ অর্থ দিয়ে তুমি শহর ঘুরে দেখতে পারবে।” জরিমানার টাকা দেওয়ার পর সকলের রাগ গিয়ে পড়ল পাথরের ওপর। সকলে মিলে পাথরটিকে ধরাধরি করে শহরের বাইরে নিয়ে গেল। যে যেমন করে পারে পাথরটাকে আচ্ছা করে দিল মার। তারপর ঠিক হল হত্যা করা হবে। সবাই মিলে পরামর্শ করতে বসল, কীভাবে এটাকে হত্যা করা হবে। অনেক কথাবার্তা হল, পরামর্শ হল, কিন্তু পাথর হত্যা করার কোনো উপায় বের করা গেল না। সকলে বিরক্ত হয়ে পাথরটিকে পথের ধারে ফেলে দিয়ে যে যার মতো বাড়ি ফিরে গেল।





কুঁড়ো খাওয়া রাজা | King's Bengali story Bangla 2024

 


কুঁড়ো খাওয়া রাজা

এক দেশে এক রাজা ছিলেন। একদিন তাঁর ইচ্ছে হল দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা নিজের চোখে দেখবেন। কিন্তু কেমন করে যাবেন? রাজপোশাকে বের হলে তো সকলেই তাকে চিনে ফেলবে। অনেক চিন্তার পর অতি সাধারণ পোশাক পরে তিনি বের হলেন। 
সঙ্গে নিলেন এক বিশ্বাসী পেয়াদা। হাঁটতে হাঁটতে রাজা শহরের বাইরে এক গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
গ্রামের কৃষক, কামার, কুমোর, তাঁতি সকলেই যার যার কাজে ব্যস্ত। হাসিখুশির মধ্য দিয়ে নিজের নিজের কাজ করছে। কারো কোনো দুঃখ নেই। শিশুরা হাসছে, খেলছে। আবার মনোযোগ দিয়ে পাঠশালায় পড়াশোনা করছে। রাজা নিজের চোখে তাঁর দেশের মানুষের অবস্থা দেখে মহাখুশি। 
রাজা তাঁর পেয়াদাকে ডেকে বললেন, 'চল হে, এখন ফেরা যাক।”


রাজা ফিরে চলছেন তাঁর রাজবাড়ির দিকে। ফেরার পথে দেখেন, এক বুড়ি উঠোনে বসে কুলো দিয়ে চাল ঝাড়ছে। রাজা উঠোনের ধার দিয়েই যাচ্ছিলেন। 
চালের কুঁড়োর গন্ধ চারদিকে ভুর ভুর করছে। রাজার খুব ভাল লাগল। রাজা পেয়াদাকে ডেকে বললেন, 'এই কুঁড়োর গন্ধ আমার খুব ভালো লাগছে । 
তুমি যেমন করে পার এই চালের কুঁড়ো জোগাড় কর।”
রাজার এ আদেশ শুনে পেয়াদা বলল, 'মহারাজ, আপনি এই তুচ্ছ কুঁড়ো দিয়ে কী করবেন ?
রাজা বললেন, “আহা! এই সুগন্ধ কুঁড়ো না জানি কত মজা! আমি কুঁড়ো— খাবো!" বলেন খাদ্য ।


"তা হোক, এমন সুগন্ধ খাবার আমি পাবোই।'
কী আর করা। মহারাজের আদেশ পালন করে পেয়াদাটি এক গামলা কুঁড়ো এনে হাজির করল।
কুঁড়ো দেখে রাজাতো মহাখুশি। একটা ঝোপের আড়ালে বসে রাজা মহানন্দে কুঁড়ো খেতে লাগলেন। '
খাওয়া শেষ করে রাজা বললেন, "আহা! এমন মজার খাবার আমি সারা জীবনেও খাইনি! তবে, সাবধান। 
এই বাওয়ার কথা কেউ যেন না জানে। জানলে তোমায় শূলে চড়াবো


রাজা সব কিছু দেখেশুনে, কুঁড়ো খেয়ে রাজবাড়িতে ফিরে এলেন। রাজকার্য নিয়ে আবার আগের মত দিন কাটতে লাগলো। রাজা তো আপন কাজে ব্যস্ত। কিন্তু পেয়ালার তো দিন কাটে না। রাজার কুঁড়ো যাওয়ার কথা বলতে বারণ। সে শুধু উসফুস করে, কিন্তু প্রাণের ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। 
এইভাবে কথা চেপে রাখতে রাখতে তার পেট উঠল ফুলে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। পেট খারাপ হয়ে গেল। সারা দিনরাত ঘরের মধ্যে পায়চারি করে আর মনে মনে বলে, 'আমাদের মহারাজ কুঁড়ো যায়।"
বিড় বিড় করেও বলতে পারে না। পাছে কেউ শুনে ফেলে। শুনে ফেললেই তো তার জীবন শেষ।
নাহ, এভাবে আর থাকা যায় না। পেট ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। ঢপ ঢপ শব্দ করে। কবে না আবার ফেটে যায়। তাকে কোথাও না কোথাও গিয়ে এ কথা বলতেই হবে


ঠিক করল গভীর জঙ্গলে গিয়েই বলবে। ভাবনামতো একদিন বনে গিয়ে হাজির হল। নীরব বন। গাছের পাতাগুলোও নড়ছে না। কথাটা বলার জন্য যেই না হাঁ করেছে ঠিক তখনই পাতার খস খস শব্দ ভেসে আসে। পেছনে ফিরে দেখে এক কাঠুরে। কথা আর বলা হল না। ফিরে এল।
কোনো উপায় না পেয়ে পর দিন সে নৌকা নিয়ে মাঝনদীতে গেল। বড় নদী, মাঝনদীতে সহজে কেউ আসে না। নদীর মাঝখানে গিয়ে হাল তুলে রেখে সে আয়োজন করছে কথাগুলো বলবে। এমন সময় অনেকগুলো জেলে নৌকা তার আশেপাশে এসে জড়ো হল। 
কী আর করা! এখানেও কথা বলা হল না। বাড়ি ফিরে গেল। মনে শান্তি নেই। পেট নিয়ে চলাফেরা কষ্ট। রাজার কাজও ঠিকমতো করতে পারে না।


জঙ্গলের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে দেখে বিশাল এক গাছ। আশেপাশে কোনো জনমানুষ নেই। গাছের গুঁড়িতে একটা গর্ত। এমন জায়গা দেখে সে মহাখুশি। গাছের গর্তের মধ্যে মুখ রেখে এত দিনকার চেপে রাখা কথা বলতে লাগল: "আমাদের মহারাজ কুঁড়ো খায়, আমাদের মহারাজা কুঁড়ো খায়। 
যেই না বলা, অমনি তার পেট ফোলা চলে গেল। আবার আগের মতো সে এখন ভাল। মনের খুশিতে রাজার কাজে মন দিল।রাজবাড়ির সামনে বিশাল এক ঢোল। এই ঢোল পিটিয়ে শহরবাসীদের সময় জানানো হয়। একদিন ঢোলটি বাজাতে গিয়ে ছিড়ে গেল। রাজা তো রেগে আগুন।


হলে সবার গর্দান যাবে। অমন বিশাল একটা ঢোল বানাতে তো বড় গাছের গুঁড়ি দরকার। দিকে দিকে গাছের খোঁজে লোক ছুটলো। অবশেষে গাছও পাওয়া গেল। 
রাজ্যে এত বড় গাছ আর নেই। এই গাছের গর্তেই পেয়াদা রাজার কুঁড়ো খাওয়ার কথা বলে পেটের ভার মুক্ত করেছিল। দেশের সবচেয়ে বড় কারিগর এল। ঢোল বানানোর মহা আয়োজন চলছে। তিন দিনের মধ্যেই ঢোল বানানো শেষ। রাজা আদেশ দিলেন, নতুন ঢোল বাজানোর দিন উৎসব হবে। মন্ত্রী, পাইক- পেয়াদা, দেশের প্রজা সবাইকে নিমন্ত্রণ জানানো হল। রাজার গুরু দিনক্ষণ ঠিক করলেন। ভোরের প্রথম আলো ফোটার মুহূর্তেই রাজা সোনার কাঠি দিয়ে ঢোলে বাড়ি অপেক্ষা করছে।


 রাজগুরু সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি হাত তুললেই রাজা সোনার কাঠি দিয়ে ঢোলে বাড়ি দেবেন। 
রাজা গুরুর দিকে তাকিয়ে আছেন। গুরু হাত তুললেন। রাজা মুহূর্তমাত্র দেরি না করে সোনার কাঠি দিয়ে ঢোলে দিলেন বাড়ি। ঢোল দ্রিম দ্রিম শব্দ না করে। আওয়াজ তুলল: আমাদের রাজা কুঁড়ো খায়। আমাদের রাজা কুঁড়ো খায়।


বটগাছের জন্মকথা | The story of the banyan tree Bangla 2024

বটগাছের জন্মকথা

                                         The story of the banyan tree  



অনেক অনেক দিন আগে এক দেশে এক রাজা ছিলেন। রাজার নাম ছিল বিদুর।
তিনি তাঁর দেশের মানুষদের খুব ভালোবাসতেন। দেশ জুড়ে ছিল সুখ আর শান্তি।
কোনো মানুষের অভাব হলে, অসুখ হলে রাজা সাথে সাথে তার খোঁজ-খবর নিতেন।
পাইক-পেয়াদারা প্রজাদের দেখাশুনা করত। পণ্ডিতগণ যত্নের সাথে শিশুদের পড়াতেন।
সেই গ্রামের কুমোর, তাঁতি, কৃষক, কামার, জেলে যার যার কাজ নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করত।
সেই গ্রামের দক্ষিণ দিকটা ছিল পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গ্রাম, ফসলের খেত আর বাগান। পাহাড়ের ওপারে সাগর। হঠাৎ একদিন সাগরের মধ্য থেকে উঠে আসে এক বিরাট দৈত্য।

পাহাড় পেরিয়ে দৈত্যটি গ্রামে ঢুকে পড়ে। ভয়ে গ্রামের মানুষ ছুটোছুটি শুরু করতে লাগলো । এ দেশে কেউ কোনো দিন এমন বিপদ দেখেওনি কিংবা শোনেওনি। 
দৈত্যটির সামনে গরু, ছাগল, ভেড়া, মোষ যা পড়ছে তাই সে গিলে খেয়ে ফেলছে। ঘরে ঘরে কান্নার রোল- চারদিকে মানুষের মধ্যে হাহাকার।
রাজার কাছে খবর গেল। রাজা তো মহা অস্থির। এমন শান্তির দেশে এ কেমন মহাবিপদ! মন্ত্রী, রাজকর্মচারীদের নিয়ে রাজা সভায় বসলেন। 
তাঁরা এক বাক্যে বললেন, 'মহারাজ দৈত্যটাকে মারার জন্য সৈন্য পাঠানো দরকার।' সৈন্যদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। 
হাতি, ঘোড়া, তীর, তলোয়ার, বল্লম নিয়ে সৈনারা যাত্রা করল। যথাসময়ে পৌঁছে গেল সৈন্যের দল। শুরু হল দৈত্যের সঙ্গে যুদ্ধ।
 তীর, বল্লম ও তলোয়ারের আঘাতে কিছুই হয় না দৈত্যের। হঠাৎ দৈত্যটি আকাশ ফাটিয়ে গর্জন করে ওঠে। সেই শব্দে হাতি, ঘোড়া আর সৈন্যরা সব অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। 
সুযোগ পেয়ে দৈত্য যত হাতি আর ঘোড়া ছিল, সবগুলোকে একে একে খেয়ে ফেলে।

দৈত্যটি বড় তালগাছের মত লম্বা। বিশাল থামের মতো পা, খড়ের গাদার মতো মাথা আর আগুনের ভাঁটার মত দুটো চোখ দৈত্যটির। 
অনেকক্ষণ পর একে একে সকল সৈন্যের জ্ঞান ফিরে আসে। সৈন্যরা ভয়ে কাঁপছে। জীবনে তারা কোনোদিন এমন অদ্ভুত বিশাল দৈত্য দেখেনি। 
সৈন্যদের নড়াচড়া দেখে দৈত্যটি থপথপ করে পা ফেলে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তার পায়ের ভারে থর থর করে মাটি কেঁপে ওঠে। 
দৈত্যটা ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, 'তোমাদের কোন ভয় নেই। আমি মানুষ খাই না। তোমাদের রাজাকে আমার কাছে আসতে বল। তার সঙ্গে আমার কথা আছে।'

আমি এক্ষুণি দৈত্যের কাছে যাব। সবাই রাজাকে বারণ করছে, *মহারাজ আপনি যাবেন না। দৈত্যটা ভয়ঙ্কর। ' রাজা কারো কথা শুনলেন না। 
ঘোড়া ছুটিয়ে তিনি দৈত্যের সামনে এসে দাঁড়ালেন। দৈত্যকে দেখে বললেন, আমিই এই দেশের রাজা। 
তুমি আমার সঙ্গে কী কথা বলতে চাও?' দৈত্য হুঙ্কার দিয়ে বলে, "শুনুন মহারাজ, সাগরে আমার বাড়ি ঘর। ওখানে আমি আর যাব না। 
এখানেই ওই পাহাড়ের পাশে আমি থাকব। আমি আপনার দেশের আর কোনো ক্ষতি করব না। তবে, প্রতিদিন ভোরে আমার খাওয়ার জন্য একটি করে মোষ অথবা গর্ পাঠাতে হবে।'

যাবার না পাঠালে আমি আপনাদের শান্তিতে থাকতে দেব না।" “তাই হবে। তবে আমার প্রজাদের তুমি কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এ কথা বলে রাজা রাজমহলে ফিরে গেলেন। সারা দেশে আদেশ জারি করলেন, প্রজারা যেন প্রতিদিন ভোরে একটি করে মহিষ অথবা গরু দৈতাকে দেয়।
এমনি করেই দিন যেতে লাগল। কিছুদিন পর রাজ্য জুড়ে হাহাকার দেখা দিল। গরু-মহিষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। চাষীরা জমি চাষ করতে পারছে না। মাঠে ফসল নেই। 
শিশুরা দুধ পায় না। সারা দেশ জুড়ে খাবার অভাব। রাজা নিজের গোলা থেকে প্রজাদের সাহায্য করলেন। কিন্তু একদিন তাও ফুরিয়ে গেল। রাজমহলেও খাদ্যের অভাব।

দয়ানু রাজা প্রজার দুঃখে মন ভার করে থাকেন। সারাক্ষণ শুধু এই বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় লোজেন। মন্ত্রীরাও কোনো উপায় বলতে পারে না।
এমনি এক সকাল। রাজা রাজমহলের বাগানে অস্থিরভাবে পায়চা করছেন। এমন সময় সোনার কাঠি হাতে লম্বা জামা পরা এক লোক রাজার সামনে এসে দাঁড়াল। 
লোকটি কাঠিটা হাত দিয়ে ধরে বলল, জয় হোক, মহারাজ। রাজা চোখ তুলে তাকালেন তার দিকে। 'কে তুমি?' আমি এক যাদুকর, মহারাজ।

"শুনেছি আপনার রাজো মহাবিপদ দেখা দিয়েছে। তাই আপনার কাছে এলাম। আমার ইচ্ছে আপনার বিপদে সাহায্য করি। 
মহারাজ যদি দয়া করে আমাকে সব কথা খুলে বলেন, তবে এই যাদুর কাঠি দিয়ে আমি চেষ্টা করে দেখব, কিছু করতে পারি কিনা।”
রাজা তাকে দৈত্যের অত্যাচারের কথা জানালেন।
যাদুকর খুব বিনয়ের সঙ্গে রাজাকে বলল,
মহারাজের যদি কষ্ট না হয় তবে আমাকে কি ওই দৈত্যের কাছে নিয়ে যাবেন??
রাজা তাকে নিয়ে যেতে রাজি হলেন। পেয়াদাদের হুকুম দিলেন দুটো ঘোড়া আনতে। ঘোড়া দুটো ছুটে চলেছে। একটার পিঠে রাজা, অপরটির পিঠে যাদুকর। 
এক সময় তাঁরা দৈত্যের কাছে পৌঁছে গেলেন। দৈত্যটা তখন কান ফাটানো শব্দে নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। রাজা ও যাদুকর ঘোড়া থেকে নামলেন। 
যাদুকর বলল, 'মহারাজ, আপনি একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ান।' রাজা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন যাদুকর কী করে।

যাদুকর তার সোনার কাঠিটাকে মাটিতে ছুঁইয়ে দৈত্যের চারিদিকে দাগ দিল। দৈত্যটা তখনও নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। সৈত্যটার মাথার কাছে এসে দাঁড়ালো যাদুকর। 
বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কাঠিটা দৈত্যের মাথার ওপর রাখল। মুহূর্তেই ঘুম ভেঙে গেল দৈত্যের।
“কে তুমি? অসময়ে আমার ঘুম ভাঙালে ?”
যাদুকর কাঠিটা দৈত্যের চোখ বরাবর ধরে বলল, "আমি তোমার যম। আজ থেকে তোমার দিন শেষ। মুহূর্তের মধ্যেই ভয়ঙ্কর দৈত্যটি যেন চুপসে গেল। 
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে যাদুকরের সামনে হাত জোড় করে বসে বলল, 'হুজুর! আমাকে আপনি প্রাণে মারবেন না।

"আমি আর মানুষের ক্ষতি করব না। আমি আবার সাগরে ফিরে যাচ্ছি। কোন দিন আর এ রাজ্যে আসব না।' যাদুকর বলল, ‘তুমি যে অন্যায় করেছ তার শাস্তি তোমাকে ভোগ করতেই হবে। এই পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন ধরে তোমাকে আমি বাঁচিয়ে রাখব। তবে এখন থেকে বটগাছ হয়ে তুমি পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। তুমি শীতল ছায়া দেবে। তোমার তলায় বসে মানুষ বিশ্রাম নেবে। পাখিরা তোমার ফল খাবে, গাছে বাসা বাঁধবে। শিশুরা তোমার ছায়ায় খেলা করবে। এই তোমার শাস্তি। আর মহারাজ, আপনাকেও আমার একটা অনুরোধ- কোনোদিন আপনি বটগাছ কাটবেন না। এ বটগাছ কাটলে এলাকার বাতাস ধীরে ধীরে দূষিত হয়ে যাবে। পাখিরা থাকবে না। মাঠের ফসলের ক্ষতি হবে। *
রাজা যাদুকরের কথামতো বটগাছটিকে বাঁচিয়ে রাখলেন। কোনোদিন এর একটি ডালও কাউকে কাটতে দিলেন না। গ্রামবাসীর মনে শান্তি ফিরে এল।

Wondershare Filmora 13 Latest Download PC Without Watermark 2024

 

Filmora 13 is the latest iteration of Wondershare's renowned video editing software, setting a new standard in the industry with its blend of simplicity and advanced features. Designed for both beginners and experienced editors, Filmora 13 offers a seamless editing experience with its intuitive interface and powerful tools.

Download Now


One of the standout features of Filmora 13 is its integration of AI-powered tools for automated editing. This includes features like Smart Trim, which intelligently identifies and removes unwanted footage, and Auto Reframe, which automatically adjusts the aspect ratio to fit different social media platforms. These AI-driven capabilities streamline the editing process, saving users time and effort while maintaining professional results.

In addition to automated editing, Filmora 13 also introduces advanced color grading options. Users have access to a wide range of presets and customizable controls, allowing them to achieve the perfect look for their videos. Whether they're aiming for a cinematic feel or a vibrant aesthetic, Filmora 13 provides the tools to make it happen.

Audio editing capabilities have also been enhanced in Filmora 13. Users can now easily remove background noise, adjust volume levels, and apply audio effects to enhance their soundtracks. This makes it easier than ever to create videos with high-quality audio that captivates audiences.

Another notable addition to Filmora 13 is improved motion tracking. Users can now easily track moving objects in their videos and apply effects or text that follow the motion. This opens up a whole new world of creative possibilities, allowing users to add dynamic elements to their videos with ease.

Whether creating vlogs, cinematic masterpieces, or social media content, Filmora 13 empowers users to bring their vision to life. With its intuitive interface, powerful features, and AI-driven tools, it's never been easier to create professional-quality videos. From beginners looking to dip their toes into video editing to experienced editors seeking advanced capabilities, Filmora 13 has something for everyone.

জ্যোৎস্নারাতের ভূত | Ghost of Jyotsnarat Bangla golpo


জ্যোৎস্নারাতের ভূত

সন্ধ্যা তখনও নামেনি। সূর্য ডোবে ডোবে। সূর্যের আলোর শেষ রেখা গাছের ওপর এসে পড়েছে। সোনালি আলোয় পাতাগুলো ঝিকমিক করছে। মা দিনের কাজগুলো শেষ করার জন্য খুব ব্যস্ত। ঠিক তখনই বাক্সপ্যাটরা নিয়ে আমার বড় ভাই শাওন হাজির। শাওনদাদা ঢাকায় থাকেন। 
পড়াশোনা করেন। অনেক দিন পরে বাড়িতে এলেন। দাদাকে দেখে আমি তো মহাখুশি। দাদা দৌড়ে এসে 'আমার পারুল বোন কই রে!' বলেই আমাকে কোলে তুলে নেন। মায়ের আনন্দমাখা চোখদুটো পানিতে টলটল করে ওঠে।

বাবা তখন বাড়ি ছিলেন না। হাটে গিয়েছেন। ফিরে এসে দাদাকে দেখে বাবাতো খুশিতে ডগমগ। 
আর আমি, সারা সন্ধ্যা দাদার কোলে বসে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছি। রাত বাড়তে লাগল। খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা যার যার মতো ঘুমিয়ে পড়েছি। শেষ রাতের দিকে হঠাৎ শুনি আমাদের কাছারি ঘরের দরজায় খট খট শব্দ।

সকলের ঘুম ভেঙে গেছে। দাদা জোরে জোরে জিজ্ঞেস করেন,
'কে? কে ওখানে? কাকে চাই?'
ওপাশ থেকে উত্তর আসে,
'আমি খোকন, খোকন বলছি।
খোকন আমার একমাত্র মামা। আমাদের গ্রাম থেকে মাইল দুই দূরে আমার নানাবাড়ি। এই সময়ে খোকন মামার গলার আওয়াজ পেয়ে দাদা ভয়ে ভয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়।

কী ব্যাপার, মামা, এত রাতে কেন? কী হয়েছে বল তো?'
কাঁপা-কাঁপা গলায় দাদা এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো জিজ্ঞেস করে। মা তো ভয়ে অস্থির। নিশ্চয়ই কোনো দুঃসংবাদ হবে। না হলে এত রাতে খোকন মামা আসবেন কেন?

মামা মাকে বললেন,
'বুবু, আব্বার কথা তো জান। মাঝরাতে উঠে হাউমাউ করে কান্না। কী ব্যাপার, কী হয়েছে। না, কোনো কথা নয়, আমি এক্ষুণি পারুলকে দেখতে চাই।'
মা বললেন,
'ঠিক আছে, সকাল হোক, তারপর রওনা দে।'
মামা বললেন,
'না বুবু, শাওন যখন এসেছে তখন আর কোনো চিন্তা নেই। আমরা এখনই রওনা দিই। ভোর হওয়ার আগেই আব্বার কাছে পারুলকে নিয়ে যেতে হবে। 
আব্বার কথা তো জানোই, না জানি আবার কোন কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন।'
আমার ঘুমঘুম ভাব অনেক আগেই কেটে গেছে। মা আমাকে কাপড়চোপড় পরিয়ে দিয়ে মামাকে বললেন, 'রাত-বিরেতের পথ, সাবধানে যাস।'
তখন ফাল্গুন মাস শেষ হয় হয়। দক্ষিণা বাতাস বইতে শুরু করেছে। বাইরে অল্প অল্প হিমহিম ভাব। তিনজন বেরিয়ে পড়লাম। ফুটফুটে জ্যোৎস্নার আলো। কুয়াশা নেই। 
চারিদিকে চুপচাপ। মাঝে-মধ্যে দূর থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসে। আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছি। গাছের পাতায় পাতায় জ্যোৎস্নার আলো পড়ে ঝলমল করছে।

আমাদের চলার পথের বামদিকে দেবদারু, আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল, সুপারি আর বাঁশঝাড়ের বাগান। ডানদিকে খোলা মাঠ। মাঝে মাঝে কিছু কিছু ন্যাড়া-মাথা কলাগাছ দাঁড়িয়ে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা মামাবাড়ির গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছি। ভারি সুন্দর জ্যোৎস্নামাখা রাত। এমন সময় দক্ষিণা বাতাসের এলোমেলো ঝাপটা এসে আছড়ে পড়ে। বাগানের গাছগুলো দোল খেতে থাকে।

নিঃশব্দ রাত যেন হঠাৎ করে হৈ হৈ শব্দে মেতে ওঠে। ফাল্গুনের ঝরাপাতার সর সর শব্দ। শিশিরের টুপটাপ, বাঁশঝাড় থেকে কান্নার মতো কোঁকানো শব্দ ভেসে আসে। ঝাউগাছ যেন বাতাসের ছোঁয়ায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। মামার হাত ধরে আমি হেঁটে চলেছি। পাশে পাশে দাদা। হঠাৎ মামা আমার হাতটা জোরে চেপে ধরেন। থর থর করে কাঁপছেন। বাঁ হাত দিয়ে দাদাকে জড়িয়ে ধরে তোতলাতে তোতলাতে বলেন, 'শা-শা- শাওন, ভূ-ভূ-ভূত।' ভয়ে আমি সিঁটকে গেছি। বুকটা দুরু দুরু করছে।

গলা শুকিয়ে কাঠ। কোন কথা বলতে পারছি না। মামার অজ্ঞান হয় হয় অবস্থা। দাদা এক ঝটকায় মামার হাত ছড়িয়ে নিয়ে বলে, ভয় পেয়ো না, মামা, আমি দেখছি। দাদা রাস্তার পাশের গাছ থেকে একটা ডাল ভেঙে নিয়ে আসে। লাঠি হাতে নিয়ে মামাকে বলে, 'মামা, কই তোমার ভূত?'
মামা কাঁপা-কাঁপা হাত তুলে দেখান, 'ও- ও ওই যে।' আমিও মামার দেখানো ভূতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সত্যি সত্যি একটা বিদঘুটে আকারের ভূত দাঁড়িয়ে আছে। সাদা ধবধবে শাড়ি পরা। মাথা নেই। বড় একটা জিব। জিবটা লকলক করছে। ওপরে তোলা দুটো হাত। যেন আমাদের ডাকছে।

ওই না দেখে আমার মাথা বন বন করে ঘুরতে লাগল। আমি মামাকে জাপটে ধরে রেখেছি। মামারও দেখি আমার মতো দশা। এরই মধ্যে দাদা ছুটে গিয়ে ভূতের কাছে হাজির। প্রথম লাঠি দিয়ে একে একে দুটো হাতই ভেঙে দেয়। এরপর পায়ে জোরে জোরে বাড়ি মারলে ভূতটা নুয়ে পড়ে। দাদা তখন চিৎকার করে আমাদের ডাকছে।' তোমরা এখানে এস। দ্যাখ, ভূতটা মেরে ফেলেছি।

আমি জানি ভূত কখনও মরে না। তাই মামার হাত ধরে ধরে ভয়ে ভয়ে এগোই। গিয়ে দেখি একটা কলাগাছ। সেই ভূত। আমার আর মামার যেন প্রাণ ফিরে এলো। মামাও হাসে, আমিও হাসি। হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যায়। দাদা বলল, 'ভূত দেখা এবং মারা সবই হল। এখন চল। নানাভাই আমাদের জন্য বসে আছেন।' ভোর হয় হয়। এমন সময় আমরা পৌঁছে গেলাম। দৌড়ে নানাভাইয়ের কোলে বসে বললাম, 'আমার জন্য তোমার মনটা কাঁদছিল?'

'হ্যাঁরে। তোকে না দেখলে আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না।' 'জানো নানা, আজ না আমরা ভূতের পাল্লায় পড়েছিলাম। দাদা না থাকলে আমাকে আর মামাকে তো তোমরা খুঁজেই পেতে না।' এ কথা শুনে নানাভাই তো হেসেই খুন। বললেন, 'ওটা তোদের চোখের ভুল।' এদিকে সব শুনে নানি তো মহা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ছুটে গিয়ে পানি পড়া নিয়ে এলেন। বললেন, 'ওদের তিনজনকে পানি পড়া খাইয়ে দিই। কী ভীষণ ব্যাপার, ভূতে যখন ধরেছে তখন এত সহজে ছাড়বে না। আবার সুযোগ পেলেই ধরবে।' আমি বলি, নানি, আগে শোন না।' একে একে সব কথা খুলে বললাম। নানি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। 'যাক বাঁচা গেল। এ যাত্রায় তোরা আসল ভূতের পাল্লায় পড়িসনি। তবে পড়তে কতক্ষণ? নে, একটু একটু করে পানি পড়া খেয়ে নে।'

নানাভাই তখন নানিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'শোনো, তোমার ওই জিনিস আর খাওয়ার দরকার নেই। এবারে ওদের ভুল ভেঙেছে। পৃথিবীতে ভূতটুত বলে কিচ্ছু নেই। আসলে ভূত হল আমাদের চোখের ও মনের ভুল।' নানি মুখ ঝামটা দিয়ে পড়া পানির বোতলটা হাতে করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন,।