বাঘের দাপট আর বুদ্ধি চাষীর গল্প
এক বনে ছিল এক বাঘ। বাঘের ছিল ভীষণ দাপট। সুযোগ পেলেই সে বনের অন্য পশুদের মেরে খেয়ে ফেলত। সবাইকে বলত, সেই নাকি বনের রাজা।এমনি এক দিন সকালে বাঘ একটা হরিণ মারল। তারপর একাই খেয়ে ফেলল আস্ত হরিণটা। খেয়েদেয়ে মনের সুখে বাঘ বেড়াতে বের হল।
বনের যে পশুই বাঘের সামনে পড়ে সেই বাঘকে দেখে ভয়ে পালায়। বাঘ মনে মনে ভীষণ মজা পায়।
এভাবে হাঁটতে হাঁটতে বাঘ চলে এল বনের শেষ মাথায়। কাছেই একটা গ্রাম।
হঠাৎ দূর পাহাড়ের নিচে বাঘের চোখ পড়ে। পাহাড়ের নিচে গাঁয়ের মাঠে এক মোষ শান্তভাবে ধীরে ধীরে লাঙল টানছে। লাঙলের পেছনে এক চাষী। চাষী থেমে থেমে কী বলে যেন চিৎকার করে চলছে। হাতে ধরা লাঠিটা দিয়ে মাঝে মাঝে মহিষটাকে পিটোচ্ছে। বাঘ তো ভারি অবাক। সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। এতবড় একটা মহিষকে ঐ রোগাপটকা লোকটা কোন সাহসে পিটোচ্ছে? ইয়া বড় শিংওয়ালা মহিষ তো ইচ্ছে করলেই চাষী লোকটিকে গুঁতো মেরে ফেলে দিতে পারে! কিন্তু তা না করে সে শুধু মার খাচ্ছে।
বাঘের কৌতূহল হল। সে পায়ে পায়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে লাগল। চাষীও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। লাঙল চালানো থামিয়ে সেও এক গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে বসে।
বাঘ ততক্ষণে মহিষটার কাছাকাছি চলে এসেছে। মহিষকে একা পেয়ে বাঘ জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা ভাই, ঐ পুঁচকে লোকটা তোমাকে মারছে আর চেঁচামেচি করছে।
আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খাচ্ছ। কেন বল তো? তুমি তো ওর চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তোমার ধারালো শিং দিয়ে তুমি ওকে ছিঁড়ে ফেলতে পার।
তা না করে তুমি ওকে ভয় পেয়ে এসব সহ্য করছ কেন মহিষ বাঘের দিকে করুণ চোখে তাকালো। দুঃখের সঙ্গে বলল, 'চাষী লোকটা ছোটখাট ঠিকই। কিন্তু তুমি কি ওর বুদ্ধির খবর রাখ?' বাঘের আরও অবাক হওয়ার পালা। সে জিজ্ঞেস করল, 'বুদ্ধি! বুদ্ধি আবার কী?'মহিষ কিছুটা বিরক্ত হল। আসলে ও নিজেও ঠিক জানে না, বুদ্ধি কী? সে বিশ্বাস করে, চাষীর এরকম কোনো শক্তি জানা আছে।
কিন্তু বাঘের কাছে তা সে স্বীকার করতে চাইল না। তাই সে বলল, 'তুমি বরং চাষীকেই সে কথা জিজ্ঞেস করো গিয়ে। বাঘ এবার চাষীর কাছে এগিয়ে গেল।
চাষী তখন আরামে হুকোয় টান দিচ্ছে। বাঘ দেখে চাষী ভয়ে কিছুটা সিঁটিয়ে গেল। কিন্তু বাঘ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল না। বাঘ জিজ্ঞেস করল, 'তোমার মোষ বলেছে, তোমার নাকি বুদ্ধি আছে। সেটা কি সত্যি?' চাষী বুঝল, এর মধ্যে অন্য কোনো ব্যাপার আছে। তা না হলে বাঘ তাকে খাওয়ার কথা না ভেবে এ প্রশ্ন করছে কেন? সে বলল, 'হ্যাঁ, সত্যি।'বাঘ বলে উঠল, 'সেটা দেখতে কেমন? আমায় একবার দেখাবে?
তোমাকে দেখাতে আমার কোনো অসুবিধে নেই। তবে মাঠে পড়ে হারিয়ে যাবার ভয়ে আজ আমি ওটা বাড়িতে রেখে এসেছি।' উত্তরে বলে চাষী। বাঘ বুদ্ধি দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল।
বলল, 'তাহলে তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে ওটা নিয়ে এসে আমাকে দেখাও।' চাষী বলল, 'নিশ্চয়ই তোমাকে তা দেখাতে পারি। কিন্তু আমি ওটা আনতে গেলে তুমি যদি আমার মোষটাকে ধরে খেয়ে ফেল? বাঘ বলল, 'না, ওকে আমি মারব না। আজ সকালে একটা আস্ত হরিণ খেয়ে বেরিয়েছি। আমার এখন খিদে নেই। পেট ভরা।' চাষী একটু ভাবল। তারপর বলল, 'ঠিক আছে। তোমাকে যদি ঐ গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখতে দাও, তবেই আমি নিশ্চিন্তে বাড়ি গিয়ে বুদ্ধি এনে দেখাতে পারি।' বাঘের আর তর সইছিল না।
বুদ্ধি জিনিসটা কেমন তা আজ তাকে দেখতেই হবে। তক্ষুনি সে চাষীর কথায় রাজি হয়ে গেল।
চাষী তাড়াতাড়ি একটা মোটা দড়ি দিয়ে বাঘকে গাছের সাথে বেঁধে ফেলল। তারপর কতগুলো শুকনো পাতা আর গাছের ডালপালা এনে জড়ো করল বাঘের চারপাশে।
সে গুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বাঘকে বলল, 'এবার দেখ। এই হচ্ছে আমার বুদ্ধি।
দাউদাউ করে বাঘের চারপাশে আগুন জ্বলতে লাগল।
আগুনের শিখা উঠে গেল অনেক উচুঁতে। বাঘের গরম লাগতে লাগল। বাঘ ছট্ফট্ করতে শুরু করল। কিন্তু দড়ি দিয়ে বাঁধা বাঘের নড়াচড়ার উপায় ছিল না। আগুনের তাপে তার শরীর প্রায় ঝল্ল্সে যাচ্ছিল।
একসময় বাঘের গায়ের দড়িগুলো আগুনে পুড়ে কালো কালো দাগ পড়ে গেল।
বাঘ মুক্ত হল বটে, কিন্তু আগুনে পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে সে বনের পথে পালিয়ে গেল। সেই থেকে বাঘের গায়ের দাগ হয়ে গেল কালো আর বাদামি।

0 comments: